দূরারোগ্য ব্যাধী প্রতিরোধে জনগনকেন্দ্রিক কৌশল ও ‘স্বাস্থ্য সম্মত নগর’

১৯৮৬ সালে কানাডার ওটোয়া শহরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে স্বাস্থ্যরক্ষার গুরূত্ব ও উন্নয়নের এক আন্তর্জাতিক কনফারেন্স হয়েছিলো, যা অটোয়া চার্টার ফর হেলথ প্রমোশন নামে পরিচিত, সেখান থেকে জনস্বাস্থ্যের এক নতুন দিগন্ত শুরু হয়েছে। সবার জন্যে স্বাস্থ্য স্লোগানের মাধ্যমে এই চার্টার থেকে মূলত কোন রোগের কারন অনু্সন্ধান থেকেও যেসব কার্যক্রম মানুষজনকে সামগ্রিকভাবে সুস্থ, সবল ও ভালো রাখতে সাহায্য করে সেদিকে নজর দেবার আহবান করা হয়েছিলো। এখানে বিশেষভাবে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে জনগনের জন্যে শুধু স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা নয় বরং স্বাস্থ্যরক্ষার সকল ব্যবস্থা নেবার ব্যাপারেও আহবান করা হয়েছে। এর মানে হলো- শুধু রোগ নিরাময়ের জন্যে প্রচুরপরিমান ডাক্তার, হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মান নয়, বরং প্রতিটা জনগন যেন প্রতিদিনের জীবনযাপন সুসাস্থ্যের সাথে বসবাস করে সে ব্যাপারে অনুকূল সামাজিক, নগর ও গ্রামীন পরিবেশসহ ইত্যাদি ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। 

 

লন্ডন শহরে প্রফেসর জিওফ্রে রোস নামে একজন প্রখ্যাত রোগ-তত্ত্ব এবং বিস্তারের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তিনি সর্বপ্রথম ‘prevention paradox’ বা রোগপ্রতিরোধের আপার্তবৈপরীত্য নামের একটা তত্ত্ব দেন। এই তত্ত্ব অনুসারে জনগোষ্ঠির যে অংশ হালকা বা মধ্যম ধরনের স্বাস্থ্য ঝুকির মধ্যে থাকে তাদের মধ্যেই তুলনামূলক উচ্চ মাত্রার ঝুকিতে থাকা জনগোষ্ঠির চেয়ে স্বাস্থ্য সমস্যা বেশি দেখা যায়। জিওফ্রে রোস  পপুলেশন লেভেল এবং হাই-রিস্ক নামের  পারস্পরিক বিরোধী কিন্তু অনেকাংশেই পরিপূরক দুই ধরনের  রোগ-প্রতিরোধ কৌশলের কথা বলেছেন। পপুলেশন লেভেল এ রোগ নিরোধক ব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে একটা বড় জনগোষ্ঠির জন্যে নেয়া হয় যাতে করে বেশিরভাগ মানুষ উপকৃত হয়। এই ধরনের রোগ নিরোধক ব্যবস্থায় শেষ মূহুর্তের হাসপাতাল বা ক্লিনিকের উপর নির্ভরতা কমিয়ে, রোগের উৎস ও বিস্তার এর দিকে বেশি নজর দেয়া হয়, এবং জনগনকে এই রোগের ঝুকি থেকে দূরে রাখতে ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়। তবে এই ধরনের কৌশল মূলত দূরারোগ্য ব্যাধি অর্থ্যাত যা সহজে নির্ণযোগ্য নয় (যেমনঃ হৃদরোগ, ডায়াবেটিক, উচ্চরক্তচাপ ইত্যাদি), সেসবের জন্যে ভালো কার্যকর হয়। অন্যদিকে হাই-রিস্ক কৌশল কাজে লাগে যখন রোগীর ঔষধ বা হাসপাতাল কেন্দ্রিক সমাধান ছাড়া অন্য কোনভাবে রোগ প্রতিরোধের উপায় থাকেনা। দূরারোগ্য বা সংক্রামক রোগে আক্রান্ত যে কোন রোগীর ক্ষেত্রেই এই ধরনের কৌশল লাগতে পারে। তবে উন্নত বিশ্বে সাধারনত রোগ প্রতিরোধের ব্যাপারে এই দুইটি কৌশলই যুগপৎ ভাবে অবলম্বন করা হয় 

 

আমাদের দেশে একটা ইংরেজী কথা খুব প্রচলিত আছে ‘prevention is better than cure’কিন্তু আসলে আমাদের শতকরা কতজন মানুষ এই বাক্যটি আপ্ত করে জীবন যাপন করেন, অথবা আরেক অর্থে কতজন চিকিতসক রোগমুক্তির জন্যে শুধুই ঔষধ নির্ভর না হয়ে জীবন যাপন পদ্ধতি যেমন খাদ্যাভাস, কায়িক পরিশ্রম, অলসতা পরিহার, পার্ক/খেলার মাঠ নিয়মিত ব্যবহার ইত্যাদি ধরনের পরামর্শের উপর বেশি নজর দেন। আমাদের দেশে যেন রোগ মোকাবেলার একমাত্র হাতিয়ার হয়েছে ঔষধ নির্ভরতা। আমার এই প্রবন্ধে আমি নজর দিয়েছি জনস্বাস্থ্য রক্ষার বা পপুলেশন-লেভেল কৌশলের মাধ্যমে বাংলাদেশে কেন দূরারোগ্য রোগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া এই মূহুর্তে দরকার সে ব্যাপারে।

 

কেন বাংলাদেশে জনগন-কেন্দ্রিক স্বাস্থ্য রক্ষা কৌশল দরকার?

 

বিভিন্ন ধরনের মহামারী রোগ মোকাবেলায় গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ বেশ সফলতার পরিচয় দিয়েছে- সে কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম ও সরকারী তরফ থেকে জনগন কেন্দ্রিক প্রতিরক্ষামূলক টিকা বা প্রতিষেধক বিতরনের মাধ্যমে আমরা পোলিও, যক্ষা, উদারাময়, ধনুষ্টংকারের মতো অনেক রোগের বিস্তার রোধ করতে সক্ষম হয়েছি। তবে এই সব রোগকে বলা যায় ছোয়াচে বা সহজে চেনাসাধ্য, যা নির্ণয় করা এবং সেই অনুযায়ী প্রতিষেধক দেয়া সম্ভব হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নয়নের ফলে একদিকে যেমন এই রোগগুলো নিয়ন্ত্রনে সফলতা এসেছে, অন্যদিকে দুরারোগ্য বা non-communicable disease এর প্রাদুর্ভাব সারা বিশ্বে তো বটেই, বাংলাদেশেও এইসব রোগের কারনে মৃত্যুহার আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে পরিচালিত বিভিন্ন দেশের রোগভারের বার্ষিক তথ্য থেকে দেখা যায় ২০০০ সাল থেকে ২০১২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জনগনের মধ্যে দূরারোগ্য রোগ জনিত মৃত্যু বেড়েছে (নিচের চিত্র দ্রষ্টব্য)।


 

এই ধরনের ব্যাধিগুলোর মধ্যে রয়েছে হৃদরোগজনিত শারিরীক সমস্যা, ডায়াবেটিস বা বহূমূত্র রোগ, ক্যান্সার, এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসনালীর প্রদাহ জনিত ব্যাধী (COPD)। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের অবসাদ ও সেই সংক্রান্ত মানসিক ব্যাধীগুলোরও উপস্থিতি ইদানিং শহরের মানুষজনের ব্যাপকভাবে দেখা যায়। এই ব্যাধিগুলো ছোয়াচে ধরনের না এবং একজন থেকে অন্যজনের মধ্যে সংক্রমিতও হয়না। এই রোগগুলোর সাধারন লক্ষনগুলো সাধারনত মধ্যবয়স থেকে দেখা যায়, যা জীবন যাত্রার মানকে প্রচন্ডভাবে ব্যহত করে। শুধু বাংলাদেশেই না,  এইসব দুরারোগ্য ব্যাধীর কারনেই এখন বিশ্বের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষনাগুলোতে দেখা যাচ্ছে শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ মারা যাচ্ছে হৃদরোগজনিত কারনে এবং শতকরা ৯০ ভাগ ঘটছে দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসনালীর প্রদাহজনিত কারনে।  এই রোগগুলোর পিছনে অন্যতম কারন ধরে নেয়া যায় জীবন যাপনের বিভিন্ন অভ্যাসজনিত কারন, যেমনঃ খাদ্যাভাস, ধূমপান, কায়িক পরিশ্রম এ অনীহা, নগর পরিবেশ দূষন, গনপরিসর বা উন্মুক্ত স্থানের অভাব, সবুজভূমি বা সবুজ আচ্ছাদনের অভাব সহ ইত্যাদি মনুষ্যসৃষ্টি কারন। তাই, এই দূরারোগ্য রোগগুলোর বিস্তার প্রতিরোধে তাই প্রতিষেধক ঔষধ কেন্দ্রিক সমাধান থেকেও একটি জনগনের জীবনযাত্রার মানে পরিবর্তনের জন্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আর এইজন্যে, এগিয়ে আসতে হবে বিভিন্ন পেশার বিশেষজ্ঞদের, পারস্পরিক জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে।

 

বাংলাদেশের বছর ভিত্তিক বয়সের পিরামিড এর ১৯৯০ (বামের চিত্র) এবং ২০১৫ (ডানের চিত্র) থেকে একটা ব্যাপার স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আগামী ১০-২০ বছর পরে যুবক বয়সী জনগনই আমাদের দেশের প্রধান অংশ হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরো বহুবছর ব্যাপকভাবে ভূমিকা রাখতে হবে। দেশের অর্থনৈতির মূল চাবিকা এইসব মানবসম্পদকে দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসইভাবে কাজে লাগানোর উদ্দেশে তাই বাংলাদেশের সরকার ও নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে এই বয়স-গোষ্ঠী যেন বিভিন দূরারোগ্য ব্যাধীতে আক্রান্ত না হয়, তার জন্যে ঝুঁকির যে কারনগুলো উপরে উল্লেখ করা হয়েছে সেই ব্যাপারে এখনই বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয়া। রোগ-বিস্তার বিশেষজ্ঞ, নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, গনমাধ্যম এর মানুষদের সমন্বয়ে পরামর্শক টীম গঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন শহরে এখন থেকেই স্বাস্থ্য সম্মত নগর গঠনের উপর জোর দেয়া উচিত।    

 

 

পরিবর্তনশীল বয়সগোষ্টির প্রাধান্য জনিত কারন ছাড়াও ভবিষ্যতে দূরারোগ্য রোগ প্রতিরোধের জন্যে আরেকটি গুরূত্বপূর্ন ইস্যু হলো স্বাস্থ্যরক্ষার পিছনে উচ্চমাত্রার ব্যক্তিগত খরচ। বাংলাদেশ জাতীয় স্বাস্থ্য হিসাব (১৯৯৭-২০১২) রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে একটি জাতীয় দৈনিকে গতবছর প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, জনগনের স্বাস্থ্যরক্ষার পেছনে বাংলাদেশের একটি পরিবারকে খরচ করতে হয় প্রায় ৬৩ শতাংশ, সরকার থেকে খরচ করা হয় মাত্র ২৩ শতাংশ। আবার পরিবারের এই খরচের ৪৩ শতাংশই চলে যায় ঔষধপত্র ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ক্রয় করতে যা বিশ্বের অন্যান্য নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে বসবাসরত পরিবারের চিকিৎসা বাবদ গড় খরচের (শতকরা ২৮ শতাংশ) অনেক বেশি। অন্যদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য রক্ষার এক হিসেবে দেখা যায়, বাংলাদেশ সরকার স্বাস্থ্য খাতে মোট খরচের মাত্র ২% জনস্বাস্থ্য রক্ষার জন্যে খরচ করে।

 

এই পরিসংখ্যান থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, মধ্যম আয়ের বাংলাদেশের সাধারন জনগনের জন্যে ঔষধ ও চিকিৎসা কেন্দ্রিক দূরারোগ্য রোগ মোকাবেলা হবে খুবই কষ্ঠসাধ্য বিষয় এবং সঠিক ও উচ্চমানের চিকিৎসার অভাবে সম্ভাব্য জনগনের ক্ষয়িষ্ণু স্বাস্থ্যসম্পদ সামগ্রিকভাবে দেশ ও অর্থনীতির জন্যে খুব খারাপ হবে। আবার বাংলাদেশ সরকারও উচ্চ আয়ের দেশগুলোর মতো জনগনের জন্যে সাধারন স্বাস্থ্যসেবা দেবার মতো পারংগমতা কবে অর্জন করতে পারবে তারও কোন নিশ্চয়তা নেই। এমতাবস্থায়, জনগনের ঔষধকেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এনে জীবনযাপন জনিত রোগ প্রতিরোধের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা উচিত। দূরারোগ্য ব্যাধীগুলোর যে কারনগুলোর ব্যাপারে উপরে উল্লেখ করা হয়েছে তার বেশিরভাগই স্বাস্থ্যসচেতনতার মাধ্যমে প্রতিরোধ সম্ভব; শুধু দরকার অভ্যাসে পরিবর্তন এবং সেই পরিবর্তন সহযোগী নগর ব্যবস্থা প্রদান করা। আর তাই একজন নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে আমি স্বাস্থ্যসম্মত নগর ব্যবস্থার উপর জোর দিচ্ছি। এই ব্যবস্থায় উচ্চপর্যায় থেকে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত নগর ব্যবস্থার অনূকরনে নগর পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, ধূমপান ও অন্যান্য ক্ষতিকর নেশাবিরোধী নীতিমালার বাস্তবায়ন, পাড়া ও মহল্লা ভিত্তিক স্বাস্থ্য সচেতনা, ভালো মানের উন্মুক্ত স্থান ও গনপরিসরের ব্যবস্থা করা ও সেগুলার ব্যবহার নিশ্চিত করার ব্যাপারে যেমন উদ্যোগ নিতে হবে, তেমনি নিম্ন বা জনগন পর্যায় থেকে দৈনন্দিন জীবন যাপনের অভ্যাস পরিবর্তনের ব্যাপারে আন্তরিক হতে হবে। আর এইভাবেই আমরা একটা অর্থনৈতিক বান্ধব স্বাস্থ্য সম্মত নগর পেতে পারি।

 

  • ARCHN'TECH

ARCHN'TECH

Connect with us